ডিজিটাল ফ্রাঙ্কেনস্টাইন

রাত ৩টা। কারওয়ান বাজারের অফিসের এসিটা হয়তো ১৮-তে দেওয়া, কিন্তু আবহাওয়াটা কেমন যেন থমথমে। মনিটরের নীল আলোয় জুনিয়র এক্সিকিউটিভ ‘রাহাত’ সাহেবের চোখ জ্বলজ্বল করছে। তার মুখে সেই শয়তানি হাসি, যা কেবল তখনই দেখা যায় যখন কোনো অলস ছাত্র পরীক্ষার আগের রাতে পুরো সিলেবাসের ‘শর্টকাট’ পেয়ে যায়।

সে চিৎকার করে উঠলো না, মনে মনে বললো, “It’s Alive!”

সে মাত্র ৫ মিনিটে ৩০টা কন্টেন্ট জেনারেট করেছে। কোনো ব্রেনস্টর্মিং নেই, কোনো ক্রিয়েটিভ টিমের ঝগড়া নেই, কেবল একটি ‘Prompt’ এবং ইনটার বাটন। স্ক্রিনে ভেসে থাকা লেখাগুলো দেখতে হুবহু মানুষের মতো, কিন্তু আদতে… মৃত।

রাহাত সাহেব মহাখুশি। তার সৃষ্টি করা কন্টেন্টগুলো দেখতে একদম পারফেক্ট। গ্রামারে কোনো ভুল নেই, দাড়ি-কমা সব জায়গায় ঠিকঠাক। কিন্তু সমস্যা একটাই, লেখাগুলোর দিকে তাকালে গা ছমছম করে।

ক্যাপশনে লেখা: 

“আমাদের প্রিমিয়াম লুঙ্গি পরিধান করে আপনার কর্মজীবনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করুন এবং সিইও-র মতো অনুভব করুন।”

ভাই, সিরিয়াসলি? লুঙ্গি পরে সিইও?

এই কন্টেন্টগুলো হলো মেরি শেলির সেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো। দেখতে মানুষের মতো হাত-পা আছে, কিন্তু ভেতরে ‘রুহ’ বা আত্মা নেই। এটা সেই বিরিয়ানির মতো, যাতে আলু আছে, মাংস আছে, কিন্তু রাঁধুনির হাতের সেই ‘জাদু’ বা ভালোবাসাটা নেই। মুখে দিলেই মনে হয় প্লাস্টিক চিবুচ্ছি।

আমাদের দেশের অডিয়েন্স কিন্তু বোকা না। তারা যখন ফেসবুকে স্ক্রল করে, তারা তখন ‘কানেকশন’ খোঁজে। তারা চায় কেউ একজন বলুক, 

“ভাই, জ্যামে আটকে আছেন? এই নেন আমাদের ঠান্ডা জুস, প্রাণটা জুড়াবে।”

কিন্তু রাহাতের ‘এআই দানব’ বলছে,  

“ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের অপটিমাইজড বেভারেজ গ্রহণ করুন।”

ফলাফল? The Graveyard of Engagement. আপনার পেইজে লাইক আছে, কিন্তু কমেন্ট বক্সে হাহাকার। মানুষ পোস্ট দেখছে, আর ভাবছে, 

“ইশ! এই পেজের এডমিন কি রোবট নাকি?” 

বিশ্বাস করুন, কাস্টমার যখন বোঝে আপনি তাকে ধোঁকা দিচ্ছেন, তখন তারা কেবল প্রোডাক্ট কেনা বন্ধ করে না, মনে মনে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে আনফলো করে দেয়।

আসলে, টেকনোলজি ব্যবহার করা খারাপ না। আমিও তো করছি। কিন্তু তলোয়ার দিয়ে যেমন ফল কাটা যায়, আবার নিজের পা-ও কাটা যায়, AI-ও ঠিক তাই।

মোরাল অফ দ্য স্টোরি:

  • এআই-কে বস না বানিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট বানান: ড্রাফট তাকে দিয়ে করান, কিন্তু পলিশটা নিজে করুন। লেখার মধ্যে একটু ‘লবণ-মরিচ’ বা দেশি মশলা মিশিয়ে দিন।
  • সত্যি কথা বলুন: ব্যবসায় সততা হলো বরকতের চাবিকাঠি। Chat GPT দিয়ে মিথ্যা আশ্বাস বা ফেক ইমোশন তৈরি না করে। কাস্টমারকে Actual Information দিয়ে আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি ইমোশন তৈরি করার চেষ্টা করুন। 
  • ভুল করতে ভয় পাবেন না: মাঝে মাঝে একটু ‘Typos’ বা কথ্য ভাষা আপনার ব্র্যান্ডকে অনেক বেশি আপন করে তোলে।

আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ: আপনার লাস্ট কয়েকটা পোস্ট চেক করুন। যদি মনে হয় ওগুলো কোনো রোবট লিখেছে, তবে এখনই ডিলিট বা এডিট করুন। নিজের ভাষায়, নিজের ইমোশন দিয়ে অডিয়েন্সের সাথে কথা বলুন।

মনে রাখবেন,  

“অ্যালগরিদম বোকা হতে পারে, কিন্তু আপনার কাস্টমারের ‘কলিজা’ আছে। সেখানে জায়গা করতে হলে রোবট হলে চলবে না, মানুষ হতে হবে।”

Share: