দ্য গ্রেট গ্যাটসবাই-এ জে গ্যাটসবি তার প্রেমিকার বাড়ির জেটির সবুজ বাতির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। আর ২০২৬ সালের ঢাকায়? আমাদের ‘আরমান ভাই’ তাকিয়ে আছেন উবার ইটস বা ফুডপান্ডা রাইডারের সেই সবুজ বাতির দিকে, যেটা ম্যাপে ধীরগতিতে তার দিকেই আসছে।
বাতাসে ধুলো, হর্নের শব্দ, আর অনিশ্চয়তা। আরমান ভাই জানেন, আগামী ৫ বছর পর তিনি কোথায় থাকবেন তা অনিশ্চিত। কিন্তু আগামী ১৫ মিনিটের মধ্যে ওই ‘এক্সট্রা চিজ লোডেড বার্গার’টা যে তার পেটে যাবে এটা নিশ্চিত।
এই নিশ্চয়তাই হলো আজকের নতুন কারেন্সি। এর নাম, “Instant Joy” (তাৎক্ষণিক সুখ)
দৃশ্যটা কল্পনা করুন…
একদিকে এক ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির এজেন্ট আরমান ভাইকে বোঝাচ্ছে,
“স্যার, আজ টাকা জমান। ১০ বছর পর পূর্বাচলে আপনার একটা ফ্ল্যাট হবে। আপনার ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল, ইনশাআল্লাহ!”
আরমান ভাই তাদের দিকে এমনভাবে তাকান, যেন তারা ভিনগ্রহের প্রাণী। ১০ বছর? ভাই, কাল সকালে বাসে সিট পাবো কিনা তার গ্যারান্টি নেই, আর আপনি দেখাচ্ছেন ১০ বছর পরের স্বপ্ন?
অন্যদিকে, একটা ফাস্ট ফুড ব্র্যান্ড বলছে,
“বস, দিনকাল খারাপ? গার্লফ্রেন্ড প্যারা দিচ্ছে? বস বকা দিয়েছে? সব ভুলে যান! এই নিন ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার। এক কামড় দিন, আর দুনিয়াকে ভুলে যান।”
বিজয় কার হবে? অবশ্যই বার্গারের। কারণ, আমাদের জেনারেশনের কাছে “ভবিষ্যতের রাজপ্রাসাদের” চেয়ে “বর্তমানের এক কাপ কফি” অনেক বেশি মূল্যবান।
আমরা এখন আর “Delayed Gratification”-এ বিশ্বাসী নই। আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টরগুলো এখন টিকটক আর রিলস দেখে এমন হয়ে গেছে যে, ৫ সেকেন্ডের বেশি আমরা কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে পারি না। রিওয়ার্ড পয়েন্ট জমিয়ে ২ বছর পর একটা তোয়ালে ফ্রি পাওয়ার চেয়ে, এখনই ১০ টাকা ডিসকাউন্ট পাওয়া আমাদের কাছে বেশি আনন্দের।
এখন আপনি বলবেন, “মানুষ কি সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? সঞ্চয় করবে না?” আসলে, ব্যাপারটা তা নয়।
একটু গভীর ভাবে ভেবে দেখুন। একজন সাধারণ চাকরিজীবী সকাল ৮টায় বের হয়, লোকাল বাসে ঝুলে অফিসে যায়, বসের ঝাড়ি খায়, আবার জ্যাম ঠেলে বাসায় ফেরে। এই যে হাড়ভাঙা খাটুনি, এর মাঝে সে কিন্তু নিজেকে একটু রিচার্জ করা করতে চায়।
ওই যে অফিস শেষে রাস্তার ধারের এক কাপ কফি অথবা চা , ওটা শুধু চা বা কফি না। ওটা হলো তার সারাদিনের কষ্টের পুরস্কার। ওটা তার কাছে একটা অমৃত। সে মনে মনে বলে,
“আলহামদুলিল্লাহ, অন্তত এই চুমুকটা তো শান্তিতে দিচ্ছি।”
মার্কেটার হিসেবে আপনি যদি তাকে এখন “৫ বছর মেয়াদী ডিপিএস” এর গল্প শোনান, সে আপনাকে মনে মনে গালি দিবে। কারণ আপনি তার বর্তমানের কষ্টের মলম না দিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্নের মুলা ঝোলাচ্ছেন।
TRUE FACT: মানুষ এখন ‘লং টার্ম প্রমিস’ বা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির চেয়ে ‘শর্ট টার্ম রিলিফ’ বা তাৎক্ষণিক উপশম বেশি খোঁজে।
মোরাল অফ দ্য স্টোরি
আপনার ব্র্যান্ড যদি এখনও সেই ৯০ দশকের স্টাইলে “ধৈর্য ধরুন, ফল পাবেন” টাইপ মার্কেটিং করে, তবে আপনি গেমের বাইরে।
- ছোট ছোট খুশি বিক্রি করুন: আপনি যদি ফ্ল্যাটও বিক্রি করেন, ১০ বছর পরে কি হবে সে স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি আজকে তাকে কোনো একটা ‘ভ্যালু’ ডেলিভার করুন। হতে পারে সেটা একটা ছোট গিফট বা একটা লাক্সারি ক্যালেন্ডার। তাকে অনুভব করান যে, সে আজ কিছু পেল।
- রিওয়ার্ড হতে হবে এখনই: “পয়েন্ট জমান” বাদ দিন। “এখন কিনলে সাথে সাথে ক্যাশব্যাক”, এটা হলো ম্যাজিক। বাংলাদেশের মানুষ নগদে বিশ্বাসী, বাকিতে না।
- প্রোডাক্ট পজিশনিং: আপনার প্রোডাক্টকে “বিলাসিতা” হিসেবে না দেখিয়ে “প্রয়োজনীয় মানসিক প্রশান্তি” বা “Mental Wellness” হিসেবে পজিশন করুন।
আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ: আপনার বর্তমান ক্যাম্পেইনের দিকে তাকান। সেখানে কি কাস্টমারকে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে? যদি হয়, তবে এখনই স্ট্র্যাটেজি বদলান।
তাদেরকে বলুন: “জীবন অনিশ্চিত, কিন্তু আমাদের অফার নিশ্চিত। অপেক্ষা কেন করবেন? খুশিটা আজই বুঝে নিন।”
কাস্টমারের মুখে হাসি ফোটান, সেল এমনিতেই আসবে। ইনশাআল্লাহ।